বিজয় চন্দ্র দাস নেত্রকোনা থেকে:
অযত্ন-অবহেলা, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জৌলুস হারাচ্ছে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার চিরাং ইউনিয়নের সাজিউড়া গ্রামে অবস্থিত যুক্ত বাংলার সাবেক অর্থমন্ত্রী ও রাজনীতিবিদ নলিনীরঞ্জন সরকারের ঐতিহ্যবাহী পৈতৃক বাড়ি। দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় বাড়িটির বিভিন্ন স্থাপনা এখন ধ্বংসের মুখে। ঐতিহাসিক এই স্থাপনার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও সচেতন মহল।
কেন্দুয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পূর্বে চিরাং ইউনিয়নের সাজিউড়া গ্রামে গেলে ঝোপঝাড়ের আড়ালে বিশাল পুকুরের পাড়ে দেখা মেলে নলিনীরঞ্জন সরকারের পৈতৃক বাড়িটির। ব্রিটিশ আমলের সাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে জরাজীর্ণ দ্বিতল ভবন ও চারপাশের উঁচু দেয়াল।
প্রায় এক একর জমির ওপর অবস্থিত বাড়িটির ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা দীর্ঘদিন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। ভবনের দেয়াল ও ছাদ থেকে খসে পড়ছে প্লাস্টার। বিভিন্ন জায়গায় লতাপাতা ও আগাছায় ঢেকে গেছে স্থাপনাগুলো।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাড়িটির মূল ফটক থেকে ভেতরে রয়েছে সুউচ্চ দুটি প্রবেশদ্বার, বিশাল পুকুর, বসতঘর ও একটি মন্দির। পাশেই রয়েছে একটি পরিত্যক্ত ডাকঘর। মন্দিরে বিভিন্ন দেবদেবীর প্রতিমা রয়েছে। স্থানীয়রা বিভিন্ন তিথিতে সেখানে পূজা-পার্বণ ও ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন করেন।
নলিনীরঞ্জন সরকারের রাজনৈতিক জীবন
নলিনীরঞ্জন সরকার ১৮৭২ সালে কেন্দুয়ার সাজিউড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম চন্দ্রনাথ সরকার। ১১ ভাইবোনের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই নলিনীরঞ্জন ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। পরবর্তী সময়ে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং ব্রিটিশ শাসনামলে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা অর্জনের পর তিনি কলকাতা সিটি করপোরেশনের প্রথম বাঙালি মেয়র নির্বাচিত হন। ভারত বিভক্তির পর পশ্চিমবঙ্গে বিধানচন্দ্র রায়ের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের মন্ত্রিসভায় অর্থ ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি অবিভক্ত বাংলার অর্থমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর নলিনীরঞ্জন সরকারের পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশের গ্রামের বাড়ি, জমি ও পুকুর রেখে ভারতে চলে যান। এরপর থেকেই বাড়িটি অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

মালিকানা নিয়ে মামলা
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দিলীপ সরকার নামে এক ব্যক্তি নিজেকে নলিনীরঞ্জন সরকারের নাতি পরিচয় দিয়ে বাড়ি ও জায়গার মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা করেছেন। মামলাটি চলমান থাকায় দীর্ঘদিন ধরে বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের কাজও বন্ধ রয়েছে। দিলীপ সরকার জানান, তিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ওই বাড়িতে বসবাস করছেন।
কেন্দুয়ার গণমাধ্যমকর্মী রোকন উদ্দিন বলেন, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই বাড়িটি নিয়ে সরকারের সঙ্গে একটি পক্ষের আদালতে মামলা চলছে। এ কারণে বাড়িটির সংরক্ষণ ও সংস্কারের বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। মামলা জটিলতার অবসান ঘটিয়ে নলিনীরঞ্জন সরকারের পৈতৃক বাড়িটি দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের জেলা কমিটির সভাপতি শামীম আহমেদ তালুকদার বলেন, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই বাড়িটি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে সংরক্ষণ করা জরুরি। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, বাড়িটির ঐতিহ্য রক্ষা করা অত্যন্ত প্রয়োজন। তবে মামলা এবং একাধিক ওয়ারিশের দাবির কারণে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে জেলা প্রশাসন এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।
সচেতন মহলের মতে, নলিনীরঞ্জন সরকারের পরিবারের রেখে যাওয়া বাড়ি, জমি ও স্থাপনাগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ প্রয়োজন। মামলা জটিলতার অবসান ঘটিয়ে ঐতিহাসিক বাড়িটি দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলে এটি ভবিষ্যতে একটি দর্শনীয় ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এতে নতুন প্রজন্মের কাছে নলিনীরঞ্জন সরকারের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অবদানও তুলে ধরা সম্ভব হবে।




















