চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পরিকল্পনা জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শিল্পাঞ্চলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ, নতুন কূপ খনন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্যদের লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম।
সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আকস্মিক বা সাময়িক সংকটের সময় শিল্প খাত যাতে গ্যাস সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সিসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সিসমিক সার্ভে পরিচালনা করা হবে।
এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। এতে বিড দাখিলের সময়সীমা নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ‘বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি ২০২৬’ প্রণয়নের কার্যক্রমও নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে গড়ে দৈনিক প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
ভবিষ্যতে আকস্মিক গ্যাস সংকটে শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রম চলছে।
এ ছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলের সুবিধাজনক স্থানে জরুরি ভিত্তিতে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।
ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মূল ভূখণ্ডে এনে আগ্রহী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের বিষয়েও সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্যাস প্রাপ্তি সাপেক্ষে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড ও বিসিকের মতো পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে
মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. তাজউদ্দীন খানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকার।
২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ লক্ষ্যে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং বায়ু, বর্জ্য, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সোলার ও অ্যাগ্রিভোলটেইক্সসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভোলায় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানা
সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোলা থেকে সরাসরি মূল ভূখণ্ডে গ্যাস নিতে পাইপলাইন নির্মাণে অন্তত সাত বছর সময় লাগতে পারে।
তাই মূল ভূখণ্ডে গ্যাস নেওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষা না করে ভোলাতেই শিল্প-কারখানা স্থাপন, সার কারখানা গড়ে তোলা এবং নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি ঠেকাতে ১৩ পদক্ষেপ
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা ঠেকাতে ১৩টি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, যথাযথ ব্যয় প্রাক্কলন না করা, ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা, দুর্বল মনিটরিং ও জবাবদিহিতার ঘাটতিসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ সমস্যা কোনো একক কারণে তৈরি হয় না। প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন, ক্রয় প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দুর্বলতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বাড়ায়।
নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে নির্ভুল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিশ্চিত করা, অনুমোদনের পর বাস্তবায়ন প্রস্তুতি দ্রুত করা এবং প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধনসংক্রান্ত নির্দেশিকা সময়োপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চলমান প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি মনিটরিং জোরদার করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ড্যাশবোর্ড স্থাপন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিয়মিত প্রকল্প পর্যালোচনা, মাঠপর্যায়ে তদারকি এবং ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

























