মোঃ আবু রায়হান ইটনা (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:
হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি আর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে। দেবীর আরাধনা, অঞ্জলি, ঢাকের বাদ্য আর সন্ধ্যার আরতিতে মুখর পূজামণ্ডপ। সীমিত সামর্থ্য, নানা প্রতিকূলতা ও জীবিকার অনিশ্চয়তার মধ্যেও আনন্দ-উচ্ছ্বাসে শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপন করছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। পূজার এই আয়োজন ঘিরে তৈরি হয়েছে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও মিলনমেলার পরিবেশ।
বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে ঘরে ঘরে চলে প্রস্তুতি। নতুন পোশাক কেনা, পূজার উপকরণ সংগ্রহ এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটানোর প্রত্যাশায় উৎসবমুখর হয়ে ওঠেন সবাই। সামর্থ্য সীমিত হলেও উৎসবের আনন্দে কোনো কমতি রাখতে চান না হাওরাঞ্চলের মানুষ।
তবে হাওরের জেলেপাড়ার অনেক পরিবারের জন্য দুর্গাপূজার আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জীবিকার টানাপোড়েনও। মাছ ধরা তাঁদের প্রধান পেশা। মাছের প্রাপ্যতা ও বাজারদরের ওপর নির্ভর করে তাঁদের আয়-রোজগার। কখনো মাছ বেশি পাওয়া গেলে সংসারে স্বস্তি ফেরে, আবার কখনো মাছের জোগান কমে গেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ে। মাছ ধরার খরচ, সংসারের ব্যয় ও অন্যান্য প্রয়োজন সামলে দুর্গাপূজার বাড়তি খরচ বহন করতে গিয়ে অনেক পরিবারকে হিসাব করে চলতে হয়।
হাওরের বাসিন্দারা জানান, হাওরে দুই হাজার পরিবারের বসবাস। এসব পরিবারের অধিকাংশই আর্থিকভাবে অসচ্ছল। অনেকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত হলেও বংশপরম্পরায় মাছ ধরা তাঁদের জীবন ও জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। সময়ের পরিবর্তনে কেউ কেউ পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন, আবার কেউ মাছের ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। পেশায় পরিবর্তন এলেও মাছ ও জলাশয়ের সঙ্গে তাঁদের নিবিড় সম্পর্ক আজও অটুট।
সন্ধ্যা নামতেই ঢাকের বাদ্যে জমে ওঠে পূজামণ্ডপের পরিবেশ। ঢাকের তালে তালে দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাস, প্রতিমা দর্শনে মানুষের ভিড় আর প্রার্থনার আবহে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উৎসবে মেতে ওঠেন, কেউ বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে ঘুরে দেখেন মণ্ডপ। আবার কেউ দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন ঢাকের তালে নাচ ও উৎসবের নানা আয়োজন।
শারদীয় দুর্গোৎসব শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। হাওরের বুকে দিঘী মাঝিপাড়ার এই উৎসবও যেন সেই বার্তাই বহন করছে—সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা থাকলেও আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার মধ্যেই উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য।
প্রার্থনা, আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর সম্প্রীতির আবহে হাওরাঞ্চলের মানুষের কাছে শারদীয় দুর্গোৎসব হয়ে উঠেছে মিলন, মানবিকতা ও পারস্পরিক বন্ধনের এক আনন্দঘন উপলক্ষ।





















