সাহারুল হক সাচ্চু, উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ)
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় এবার দেশি মাছের আকাল দেখা দেওয়ায় শুঁটকি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত কাঁচা মাছ না পাওয়ায় ভরা মৌসুমেও পুরোদমে চালু হয়নি শুঁটকির চাতালগুলো। অন্যদিকে, বাজারে কাঁচা মাছের দাম বেশি হলেও চাহিদা অনুযায়ী মাছ মিলছে না। ফলে ব্যবসায় লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন চাতাল মালিকেরা। কাজের অভাবে বেকার সময় কাটাচ্ছেন শুঁটকি চাতালে কাজ করা অনেক নারী ও পুরুষ শ্রমিক।
উল্লাপাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবছর বর্ষার মাঝামাঝি সময়ে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩৫টি শুঁটকির চাতাল গড়ে ওঠে। উপজেলার বড় পাঙ্গাসী, বাঙ্গালা ও উধুনিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় এসব চাতালে দেশি প্রজাতির মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হয়। পরে সেসব শুঁটকি দেশের বিভিন্ন পাইকারি মোকামে বিক্রি করা হয়। তবে এবার মাছের সংকটে চাতালগুলোতে স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য নেই।
মাছ নেই, পড়ে আছে চাতালের বানা
সম্প্রতি সরেজমিনে উপজেলার বড় পাঙ্গাসী ইউনিয়নের ত্রিমোহনী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শুঁটকি তৈরির জন্য বাঁশের মাচা ও বানা প্রস্তুত করে রাখা হলেও অধিকাংশ চাতালে মাছ শুকানোর কাজ শুরু হয়নি। অনেক চাতালের বানা এখনো গুটিয়ে রাখা হয়েছে। কোথাও দু-একটি বানায় অল্প পরিমাণ মাছ শুকানো হচ্ছে। অথচ প্রতিবছর এ সময়ে চাতালগুলোতে শ্রমিকদের ব্যস্ততা ও হাঁকডাকে মুখর থাকত পুরো এলাকা।
ত্রিমোহনী সেতুর পাশের বড় একটি চাতালে এবার মাত্র দুটি বানায় মাছ শুকানো হচ্ছে। সেখানে কাজ করছেন একজন নারী শ্রমিক। সেতুর দক্ষিণ পাশেও একটি বানায় মাছ শুকাতে দেখা গেছে। উধুনিয়া সড়কের পাশের অধিকাংশ চাতালের বানা এখনো খোলা হয়নি।
চাতালসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বর্ষার শুরুতেই শুঁটকি তৈরির প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। শ্রাবণ মাসের প্রথম দিকে চাতালের মাচা তৈরি ও বাঁশের বানা প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু মাছের অভাবে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি।
স্বাভাবিক বন্যা না হওয়ায় কমেছে দেশি মাছ
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার বর্ষা মৌসুম পেরিয়ে ভাদ্র-আশ্বিনেও এলাকায় স্বাভাবিক বন্যা হয়নি। এতে মাঠঘাট, খালবিল ও জলাভূমিতে মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উপজেলার মোহনপুর, বড় পাঙ্গাসী ও উধুনিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় চায়না দুয়ারি, বাদাই জালসহ বিভিন্ন ধরনের জালে মাছ ধরা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে শুঁটকি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ দেশি মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে যে মাছ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর দামও তুলনামূলক বেশি।
শুঁটকি তৈরিতে সাধারণত পুঁটি, খলিশা, টেংরা, চাপিলা, মোয়া, টাকি ও অন্যান্য দেশি মাছ ব্যবহার করা হয়। এসব মাছের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন কমে গেছে।
কমেছে উৎপাদন, কাজ হারাচ্ছেন শ্রমিকরা
বড় পাঙ্গাসী ইউনিয়নের আউয়াল প্রামাণিক দীর্ঘদিন ধরে শুঁটকি চাতালের ব্যবসা করছেন। ত্রিমোহনী সেতুর পাশে চাতাল পরিচালনার পাশাপাশি তিনি শুঁটকি মাছ বিভিন্ন পাইকারি মোকামে বিক্রি করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকায় আটজন মিলে শুঁটকি চাতালের ব্যবসা করছেন। কিন্তু এবার প্রস্তুতি নেওয়ার পরও মাছের অভাবে তাঁরা স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন করতে পারছেন না।
আউয়াল প্রামাণিক বলেন, “এবার চাতাল দেওয়ার জন্য সব প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। হাটবাজারে কাঁচা মাছের দামও বেশি। তাই খুব অল্প পরিমাণ মাছ শুকিয়ে মোকামে বিক্রি করতে পেরেছি।”
তিনি জানান, তাঁর চাতালে আগে নারী-পুরুষ মিলিয়ে দৈনিক প্রায় ২০ জন শ্রমিক কাজ করতেন। বর্তমানে সেখানে মাত্র তিন-চারজন কাজ করছেন। উৎপাদন স্বাভাবিক না হওয়ায় সৈয়দপুর, নীলফামারী, রংপুর ও ঢাকার পাইকারি বাজারে আগের মতো শুঁটকি পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
আউয়াল প্রামাণিক আরও বলেন, “এখন বিভিন্ন এলাকায় শুঁটকি তৈরির উপযোগী মাছ পাওয়া যায় কি না, তার খোঁজখবর নিচ্ছি। আশা করছি, কার্তিক মাস থেকে বন্যার পানি নেমে গেলে খালবিল ও ডোবায় কিছু মাছ পাওয়া যাবে। তখন চাতালগুলোতে উৎপাদন বাড়তে পারে।”
চাতাল মালিকদের হিসাবে, স্বাভাবিক সময়ে উল্লাপাড়ার বিভিন্ন চাতাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ মণ শুঁটকি মাছ দেশের বিভিন্ন পাইকারি মোকামে বিক্রি হয়। তবে এবার উৎপাদন কমে যাওয়ায় সেই পরিমাণ শুঁটকি বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে না।
চাতালের নারী শ্রমিক ময়না খাতুন বলেন, “মাছ নেই, তাই কাজও নেই। কোনো দিন দুদিন কাজ করি, আবার পরের এক-দুদিন বসে থাকতে হয়। নিয়মিত কাজ না থাকায় সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে।”
মাছের উৎপাদন বাড়ার আশা মৎস্য বিভাগের
উল্লাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান বলেন, এবার উল্লাপাড়া অঞ্চলে স্বাভাবিক বন্যা হয়নি। বন্যার পানি কম থাকায় মাঠঘাট ও জলাভূমিতে দেশি মাছের বংশবৃদ্ধিও প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি।
তিনি বলেন, উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মোহনপুর, বড় পাঙ্গাসী, উধুনিয়া ও বাঙ্গালা ইউনিয়নে বর্ষার স্বাভাবিক বন্যার পানিতে দেশি প্রজাতির মাছের ব্যাপক বংশবৃদ্ধি হয়। এসব এলাকার মাছ থেকেই শুঁটকির চাতালগুলোতে মূলত মাছের সরবরাহ আসে। কিন্তু এবার মাছ কম থাকায় চাতালগুলো পুরোদমে চালু হয়নি বলে তিনি জেনেছেন।
তবে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর খালবিল ও জলাশয়ে শুঁটকি তৈরির উপযোগী কিছু মাছ পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করছেন এই কর্মকর্তা।
তিনি আরও বলেন, উল্লাপাড়ার শুঁটকি মাছের দেশজুড়ে সুনাম ও চাহিদা রয়েছে। এ সুনাম ধরে রাখতে চাতাল মালিকদের নিরাপদ ও মানসম্মত শুঁটকি উৎপাদনের পাশাপাশি চাতাল এলাকার পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
সব মিলিয়ে মাছের সংকটে উল্লাপাড়ার শুঁটকি শিল্পে এবার স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত মাছের সরবরাহ না বাড়লে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। এতে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়বেন এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকেরাও।





















