মিয়া মোহাম্মদ ছিদ্দিক কটিয়াদী(কিশোরগঞ্জ)প্রতিনিধিঃ
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে ঢাক-ঢোল ও বাদ্যযন্ত্রের বিরাট হাট বসেছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে। ঢাক-ঢোল ছাড়াও নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র ওঠে এই হাটে। তবে কোনো বাদ্যযন্ত্র বেচাকেনা হয় না এখানে। বাদ্যযন্ত্রের বাদকেরা অর্থের বিনিময়ে কেবল পূজা চলাকালীন আয়োজকদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন।
কার চুক্তিমূল্য কত হবে, তা নির্ধারণ হয় ঢাকিদের দক্ষতার ওপর। পূজা উদযাপন কমিটির কর্তারা যাচাই করে নেন ঢাকিদের দক্ষতা। ৫০০ বছরের পুরোনো এ হাটে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আগত বাদ্যদলকে ভাড়া করতে ভিড় করছেন বিভিন্ন এলাকার পূজারীরা। তাদের নিরাপত্তায় সতর্ক ভূমিকা পালন করছেন এলাকাবাসী ও পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থেকে শুরু হওয়া এ হাট চলবে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকাল পর্যন্ত।
আয়োজকরা জানান, দুই দিনে তিনশর মতো ঢাকির সমাগম ঘটে এই হাটে। ঢাক ছাড়া অন্য কিছুর কেনাবেচা হয় না এখানে।বর্তমানে অনেক ঢাকিই চুক্তিবদ্ধ হন মোবাইল ফোনে। ফলে দিন দিন কিছুটা হলেও এ হাটের ঐতিহ্য ম্লান হচ্ছে। ঢাকের হাটের ঐতিহ্য ধরে রাখতে স্থানীয় সচেতনমহলসহ প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
জনশ্রুতি আছে, ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে স্থানীয় সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় সর্বপ্রথম তার রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার উত্তরে চারিপাড়া গ্রামে ছিল রাজার প্রাসাদ। পূজা উপলক্ষে রাজাপ্রাসাদ থেকে সুদূর বিক্রমপুর (মুন্সিগঞ্জ) পরগণার বিভিন্ন স্থানে বার্তা পাঠানো হতো ঢাক-ঢোল বাঁশিসহ বাদ্যযন্ত্রীদের আগমনের জন্য। সে সময় নৌপথ ব্যবহার করা হতো। বাদ্যযন্ত্রীরা কটিয়াদী-মঠখোলো সড়কের পাশে পুরনো ব্রহ্মপুএ নদের তীরে যাত্রাঘাট নামের স্থানে পূজার দুইদিন আগে এসে পৌঁছাতেন।
পরবর্তীতে পার্শ্ববর্তী মসুয়া গ্রামে বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষ হরিকিশোর রায় চৌধুরীর বাড়িতে মহা ধুমধামে পূজা শুরু হয়। সেইসঙ্গে চলে বিভিন্ন পূজার বাদ্যযন্ত্রের প্রতিযোগিতা। দিন দিন পূজার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন জমিদারদের মধ্যে ঢাকের হাটের স্থান নির্ধারণ নিয়ে দ¦ন্দ্ব শুরু হয়। অবশেষে যাত্রাঘাট থেকে স্থান পরিবর্তিত হয়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরবর্তী আড়িয়াল খাঁ নদের তীরবর্তী কটিয়াদী পুরনো বাজারে প্রেসক্লাবের সামনে বিরাট ঢাকের হাট গড়ে উঠে।
সরেজমিন দেখা যায়, দুর্গাপূজার আগেই ঢাকের হাটে উৎসবের সুর। শত শত বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুখরিত চারদিক। হাটে বাদকরা একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঢাকঢোল, ড্রাম, বাঁশি, সানাই, ঝনঝনিসহ বাহারি বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছেন। বাদ্যের তালে তালে চলছে সুরেলা লড়াই। আর পূজা আয়োজকরা যাচাই করে দেখছেন, সঙ্গে চলছে দরদামও। ঢাক-ঢোল, কাঁসর, সানাই, বাঁশি, কর্তাল, খঞ্জরিসহ বাঙালির চিরচেনা সব বাদ্যযন্ত্রের পসরা সাজিয়েহাটে বিক্রির উদ্দেশ্যে বাজনা বাজানোর নৈপুণ্য প্রদর্শনের মহড়ায় মেতে ওঠে এসব বাদক দল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা এসব বাদক দলকে পূজামণ্ডপের জন্য ভাড়া করতে বিভিন্ন এলাকার পূজারিরা ভিড় করেন। ১০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ভাড়ায় মিলছে এসব বাদক দল।
সাধারণত একটি ঢাক ১০ থেকে ১২ হাজার, ঢোল ৭-৮ হাজার, বাঁশি প্রকারভেদে ৫ থেকে ৭ হাজার, ব্যান্ডপার্টি ছোট ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার এবং বড় ৬০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ভাড়া হয়। বাদ্যযন্ত্রীরা পূজামণ্ডপে বাজনা বাজিয়ে দর্শক ও ভক্তদের আকৃষ্ঠ করেন
দোহারের নবাবগঞ্জ থেকে তিনজনের একটি বাদক দলের নেতা হয়ে হাটে এসেছেন সুজন মালাকার। তিনি জানান, এবার পূজার আয়োজন বেশি হওয়ায় বাদক দলের চাহিদাও বেড়েছে। তাঁর দলের পারিশ্রমিক কেউ কেউ ৪০ হাজার টাকা বলছেন, তবে তারা ৬০ হাজার টাকার কমে যাবেন না। কথা হয় আরেক বাদক দলের নেতা কিশোরগঞ্জ সদরের মো. রোকনের সঙ্গে। যিনি ঢাকঢোলের সাতজনের একটি দল নিয়ে এসেছেন। বললেন, এটি তাঁর মূল পেশা না। শখ আর বাড়তি আয়ের জন্য এসব করেন।
নরসিংদীর মনোহরদী থেকে আসা বাদক দলনেতা ফারুক মিয়া জানান, এক যুগ ধরে তারা এই হাটে আসেন। তাঁর দলের পারিশ্রমিক কেউ কেউ ৮০ হাজার টাকা বলছেন, তবে তারা এক লাখ টাকার কমে যাবেন না।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া থেকে বাদ্যদল বায়না করতে এসেছেন উৎপল কুমার। তিনি বলেন, এই হাটে শত শত ঢাকি ও বাদককে একসঙ্গে পাওয়া যায়। বাড়তি পাওনা হিসেবে আমরা বাজনা পরখ করে নিতে পারি। তাই এই হাট থেকে প্রতিবছরই পূজার জন্য ঢাকঢোল বায়না করে নিয়ে যাই। এবারও এসেছি।
কটিয়াদী পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি দিলীপ কুমার সাহা জানান, পঞ্চমীর দিন শতাধিক ঢাকি দল চুক্তিবদ্ধ হয়ে হাট ছেড়েছেন। সর্বোচ্চ ১ লাখ এবং সর্বনিম্ন ৫ হাজার টাকায় ঢাকিরা মণ্ডপে গেছেন। সবশেষে দেখা যাবে কিছু ঢাকির জন্য মণ্ডপ মিলবে না। তাদের খাওয়াদাওয়া ও যাতায়াতের খরচ আমরা বহন করব।
কটিয়াদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন,পূজাসহ ঢাকের হাটের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। হাটটি সবসময় আমাদের নজরে রয়েছে।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট জালাল উদ্দিন বলেন, ৫শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকঢোলের হাট কটিয়াদী উপজেলার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।এ ঐতিহ্য জেলার ও দেশের গর্ব।




















