এসকে দোয়েল, পঞ্চগড়:
ভোরের আকাশ তখনো আড়মোড়া ভাঙেনি। উত্তরের হিমেল হাওয়ায় হালকা কুয়াশার আবরণ। কিন্তু মহানন্দা নদীর তীরে তেঁতুলিয়া ডাকবাংলোর বারান্দায় আর পাথুরে পাড়ে তখন কয়েকশ মানুষের চোখে এক অদ্ভুত প্রতীক্ষা। সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ উত্তরের দিগন্তে। ঠিক ভোর ৬টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই যেন এক জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় মেঘের পর্দা সরে গেল। আর ঠিক তখনই দৃশ্যমান হলো তুষারশুভ্র এক বিশাল অবয়ব—বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা।
সূর্যের প্রথম সোনালি রশ্মি যখন বরফে ঢাকা পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ল, শুভ্র সাদা পাহাড় মুহূর্তেই হয়ে উঠল ঝকঝকে সোনালি। এ যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত ক্যানভাস, যেখানে মুহূর্তের ব্যবধানে রং বদলানোর খেলায় মেতেছে হিমালয়।
মঙ্গবার ও আজ বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকাল থেকেই পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে দেখা মিলছে কাঞ্চনজঙ্ঘার এই মনোমুগ্ধকর রূপ। পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে হিমালয়ের এই বিশালত্ব উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের ঢল নেমেছে উত্তরের এই জনপদে।
মেঘ-পাহাড়ের লুকোচুরি ও পর্যটকদের তৃপ্তি
কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা পাওয়াটা অনেকটা ভাগ্যের ব্যাপার। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে অনেক সময় পর্যটকদের কয়েক দিন অপেক্ষা করেও হতাশ হয়ে ফিরতে হয়। রাজশাহী থেকে আসা ব্যবসায়ী কায়সার মাহমুদ ও শিক্ষক রাসেল জানান তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা।
তাঁরা বলেন, “ভোরের দিকে আমরা অনেকটা হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। প্রথমে মেঘ আর কুয়াশায় ঢেকে ছিল আকাশ।
কিন্তু হাল ছাড়িনি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন মেঘ কেটে কাঞ্চনজঙ্ঘা জেগে উঠল, তখন যে দৃশ্য দেখলাম, তা সারা জীবন মনে থাকবে। সব ক্লান্তি এক নিমিষেই মুছে গেছে।”
ঢাকা থেকে বন্ধুদের নিয়ে আসা পর্যটক বাদল ও নিহান উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের আসা সার্থক হয়েছে। আকাশ পরিষ্কার থাকায় পাহাড়ের চূড়াটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখতে পেয়েছি।”
চায়ের কাপে দাঁড়িয়ে হিমালয় দর্শন
তেঁতুলিয়ার বিশেষত্ব হলো, এখানকার সমতলের সবুজ চা বাগানের ভেতর দিয়ে দাঁড়িয়ে খালি চোখেই পাহাড়ের চূড়া উপভোগ করা যায়। বাইনোকুলার ছাড়াই কাঞ্চনজঙ্ঘার এই বিশালত্ব পর্যটকদের মুগ্ধ করে। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার পাশাপাশি পর্যটকরা বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, মহানন্দা নদীতে পাথর সংগ্রহের দৃশ্য এবং সীমান্ত এলাকার নান্দনিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছেন।
আবহাওয়া ও প্রশাসনের তৎপরতা
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্র নাথ রায় জানান, প্রতিবছর অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকে বায়ুমণ্ডল স্বচ্ছ হয়ে ওঠায় কাঞ্চনজঙ্ঘা দৃশ্যমান হতে শুরু করে। আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে নভেম্বর পর্যন্ত এটি
নিয়মিত দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পর্যটকদের আকাশের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে আসার পরামর্শ দেন তিনি।
পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভিন জানান, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার মৌসুমে তেঁতুলিয়ায় পর্যটকদের ভিড় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পর্যটকদের নিরাপত্তা, আবাসন ও স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। স্থানীয় ডাকবাংলো ও আবাসিক হোটেলগুলোকেও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ভোরের সোনালি আভা থেকে দুপুরের ধবধবে সাদা—সময়ের সাথে সাথে কাঞ্চনজঙ্ঘার এই রূপ বদল তেঁতুলিয়াকে করে তুলেছে পর্যটনের স্বর্গরাজ্য। শরতের নীল আকাশ আর দূরে বরফে ঢাকা পাহাড়ের মিতালি দেখতে আপনিও কি প্রস্তুত? হিমালয় কন্যার এই মায়াবী হাতছানি এখন কেবল তেঁতুলিয়ার আকাশেই!





















