কক্সবাজার সৈকতে ৫০ ফুটের দৈত্য ভাস্কর্য,পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ

কক্সবাজার সৈকতে ৫০ ফুটের দৈত্য ভাস্কর্য,পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ

কক্সবাজার সৈকতে ৫০ ফুটের দৈত্য ভাস্কর্য

শাহেদ মিজান, কক্সবাজার:

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বেলাভূমিতে স্থাপন করা হয়েছে ৫০ ফুট উচ্চতার এক প্লাস্টিক দৈত্য। এই বিশালাকার প্রাণহীন দৈত্যটি সৈকতের বিচরণ করা পর্যটক ও দর্শনার্থীদের দৃষ্টি মুহূর্তে কেড়ে নেয়। দানবটির শরীরজুড়ে জড়িয়ে আছে প্লাস্টিক বর্জ্য আর হাতে ধরে উপড়ে ফেলা একটি নারকেল গাছ। কক্সবাজার সৈকতের সুগন্ধা ও সী-গাল পয়েন্টের মাঝামাঝি বেলাভূমিতে স্থাপন করা হয়েছে ভাস্কর্যটি।
দূর থেকে দেখে মনে হয় সমুদ্রের গভীর থেকে উঠে এসেছে ভয়ংকর কোনো দৈত্য! মনুষ্য কর্তৃক পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতির সতকর্তা দিয়ে পরিবেশ রক্ষার বার্তা ছড়িয়ে দিতে এই প্লাস্টিক দৈত্যটি তৈরি করা হয়েছ। যদিও গত কয়েক বছর প্রতিবছর পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে এমন দৈত্য ভাস্কর্য তৈরি করা হয়।
গত সোমবার (১২ অক্টোবর) রাতে প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করেছেন জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান। এসময় পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শাহিদুল আলমসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ভাস্কর্যটির প্রদর্শনী আগামী চার মাস চলবে। এই সময়ে কয়েক লাখ পর্যটক ও স্থানীয় মানুষের কাছে সমুদ্র দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরা এবং প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বশীল আচরণ উৎসাহিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।
অন্যদিকে প্রকল্পের অংশ হিসেবে ভাস্কর্যটির প্রদর্শনীর পাশাপাশি সৈকতে নির্মাণ করা হয়েছে একটি বিশেষ থিয়েটার। এখানে ‘দায়িত্বশীল পর্যটন’ বিষয়ে সচেতনতামূলক চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হবে। চলচ্চিত্রটি দেখতে প্রবেশমূল্য হিসেবে দর্শনার্থীদের সঙ্গে আনতে হবে দুটি পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বোতল। এর মাধ্যমে বিনোদনের পাশাপাশি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হবে।
আয়োজকরা জানান, সমুদ্র ও আশপাশ থেকে সংগ্রহ করা পাঁচ টন প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই ভাস্কর্য। কক্সবাজারের ইনানী, টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিন সৈকত থেকে সংগ্রহ করা প্লাস্টিক দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিল্পীরা ২০দিনের শ্রমে এটি নির্মাণ করেছেন।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবক মুহাম্মদ মুবারক বলেন, ৫০ ফুটের এ প্লাস্টিক দানব তৈরিতে পাঁচ টন প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছে। গাছ উপড়ে ফেলার প্রতীকী দৃশ্যের মাধ্যমে আমরা দেখাতে চেয়েছি, এই দূষণ কীভাবে আমাদের পরিবেশ ও অক্সিজেনের উৎসকে হুমকির মুখে ফেলছে। প্লাস্টিক দূষণের কারণে নীরবে যে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে, তা অনেক সময় আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। সেই অদৃশ্য বিপর্যয়কেই দৃশ্যমান করার চেষ্টা করা হয়েছে ভাস্কর্যে।

বিজ্ঞাপন

এই ভাস্কর্যটির প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, সমুদ্র আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র এবং অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ মানুষের অসচেতনতার কারণে প্রতিনিয়ত প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্র ও সৈকতের পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে। এ ধরনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ মানুষের সামনে দূষণের ভয়াবহতা দৃশ্যমান করে তুলবে এবং নিজেদের আচরণ পরিবর্তনে উৎসাহিত করবে। কক্সবাজারকে পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি পর্যটক, স্থানীয় জনগণ, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
আয়োজক বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের পরিচালক জামাল উদ্দিন বলেন, পরিত্যক্ত প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি এই দানব আসলে আমাদের অসচেতনতারই প্রতিচ্ছবি। আমরা চাই, মানুষ এই ভাস্কর্য দেখে শুধু ছবি তুলে চলে যাবে না; বরং নিজের ব্যবহৃত প্লাস্টিক কোথায় ফেলছে, সেটি সমুদ্রের জন্য কী ক্ষতি তৈরি করছে-সেই প্রশ্নটিও নিজের কাছে করবে।

ব্যতিক্রমী এ শিল্পকর্ম দেখতে ভিড় করছেন পর্যটক ও স্থানীয়রা। প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা তুলে ধরে মানুষকে সচেতন করাই এর মূল উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছে প্লাস্টিক দূষণবিরোধী প্রতীকী আন্দোলন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন নেতৃবৃন্দ। অতীতের মতো এবারো কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় পরিবেশ দূষণবিরোধী প্রতীকী আন্দোলন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসনের এডিএম তাসনীম জাহান।
বিদ্যানন্দ কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২২ সাল থেকে কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিনে প্লাস্টিকবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। সারা বছর কক্সবাজারে পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বিনিময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে ‘প্লাস্টিক এক্সচেঞ্জ স্টোর’ চালু রয়েছে। সেখানে সংগৃহীত প্লাস্টিকের একটি অংশ ব্যবহার করে এই ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়।

ট্যাগ
জনপ্রিয়
কুড়িগ্রামে দৈনিক কালবেলার জেলা কার্যালয় উদ্বোধন, জেলার রাজনৈতিক সাংবাদিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের মিলন মেলায় পরিণত

কুড়িগ্রামে দৈনিক কালবেলার জেলা কার্যালয় উদ্বোধন, জেলার রাজনৈতিক সাংবাদিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের মিলন মেলায় পরিণত

কক্সবাজার সৈকতে ৫০ ফুটের দৈত্য ভাস্কর্য,পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ

আপডেট সময় : ১২:১১:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

শাহেদ মিজান, কক্সবাজার:

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বেলাভূমিতে স্থাপন করা হয়েছে ৫০ ফুট উচ্চতার এক প্লাস্টিক দৈত্য। এই বিশালাকার প্রাণহীন দৈত্যটি সৈকতের বিচরণ করা পর্যটক ও দর্শনার্থীদের দৃষ্টি মুহূর্তে কেড়ে নেয়। দানবটির শরীরজুড়ে জড়িয়ে আছে প্লাস্টিক বর্জ্য আর হাতে ধরে উপড়ে ফেলা একটি নারকেল গাছ। কক্সবাজার সৈকতের সুগন্ধা ও সী-গাল পয়েন্টের মাঝামাঝি বেলাভূমিতে স্থাপন করা হয়েছে ভাস্কর্যটি।
দূর থেকে দেখে মনে হয় সমুদ্রের গভীর থেকে উঠে এসেছে ভয়ংকর কোনো দৈত্য! মনুষ্য কর্তৃক পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতির সতকর্তা দিয়ে পরিবেশ রক্ষার বার্তা ছড়িয়ে দিতে এই প্লাস্টিক দৈত্যটি তৈরি করা হয়েছ। যদিও গত কয়েক বছর প্রতিবছর পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে এমন দৈত্য ভাস্কর্য তৈরি করা হয়।
গত সোমবার (১২ অক্টোবর) রাতে প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করেছেন জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান। এসময় পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শাহিদুল আলমসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ভাস্কর্যটির প্রদর্শনী আগামী চার মাস চলবে। এই সময়ে কয়েক লাখ পর্যটক ও স্থানীয় মানুষের কাছে সমুদ্র দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরা এবং প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বশীল আচরণ উৎসাহিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।
অন্যদিকে প্রকল্পের অংশ হিসেবে ভাস্কর্যটির প্রদর্শনীর পাশাপাশি সৈকতে নির্মাণ করা হয়েছে একটি বিশেষ থিয়েটার। এখানে ‘দায়িত্বশীল পর্যটন’ বিষয়ে সচেতনতামূলক চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হবে। চলচ্চিত্রটি দেখতে প্রবেশমূল্য হিসেবে দর্শনার্থীদের সঙ্গে আনতে হবে দুটি পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বোতল। এর মাধ্যমে বিনোদনের পাশাপাশি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হবে।
আয়োজকরা জানান, সমুদ্র ও আশপাশ থেকে সংগ্রহ করা পাঁচ টন প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই ভাস্কর্য। কক্সবাজারের ইনানী, টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিন সৈকত থেকে সংগ্রহ করা প্লাস্টিক দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিল্পীরা ২০দিনের শ্রমে এটি নির্মাণ করেছেন।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবক মুহাম্মদ মুবারক বলেন, ৫০ ফুটের এ প্লাস্টিক দানব তৈরিতে পাঁচ টন প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছে। গাছ উপড়ে ফেলার প্রতীকী দৃশ্যের মাধ্যমে আমরা দেখাতে চেয়েছি, এই দূষণ কীভাবে আমাদের পরিবেশ ও অক্সিজেনের উৎসকে হুমকির মুখে ফেলছে। প্লাস্টিক দূষণের কারণে নীরবে যে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে, তা অনেক সময় আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। সেই অদৃশ্য বিপর্যয়কেই দৃশ্যমান করার চেষ্টা করা হয়েছে ভাস্কর্যে।

বিজ্ঞাপন

এই ভাস্কর্যটির প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, সমুদ্র আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র এবং অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ মানুষের অসচেতনতার কারণে প্রতিনিয়ত প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্র ও সৈকতের পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে। এ ধরনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ মানুষের সামনে দূষণের ভয়াবহতা দৃশ্যমান করে তুলবে এবং নিজেদের আচরণ পরিবর্তনে উৎসাহিত করবে। কক্সবাজারকে পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি পর্যটক, স্থানীয় জনগণ, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
আয়োজক বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের পরিচালক জামাল উদ্দিন বলেন, পরিত্যক্ত প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি এই দানব আসলে আমাদের অসচেতনতারই প্রতিচ্ছবি। আমরা চাই, মানুষ এই ভাস্কর্য দেখে শুধু ছবি তুলে চলে যাবে না; বরং নিজের ব্যবহৃত প্লাস্টিক কোথায় ফেলছে, সেটি সমুদ্রের জন্য কী ক্ষতি তৈরি করছে-সেই প্রশ্নটিও নিজের কাছে করবে।

ব্যতিক্রমী এ শিল্পকর্ম দেখতে ভিড় করছেন পর্যটক ও স্থানীয়রা। প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা তুলে ধরে মানুষকে সচেতন করাই এর মূল উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছে প্লাস্টিক দূষণবিরোধী প্রতীকী আন্দোলন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন নেতৃবৃন্দ। অতীতের মতো এবারো কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় পরিবেশ দূষণবিরোধী প্রতীকী আন্দোলন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসনের এডিএম তাসনীম জাহান।
বিদ্যানন্দ কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২২ সাল থেকে কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিনে প্লাস্টিকবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। সারা বছর কক্সবাজারে পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বিনিময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে ‘প্লাস্টিক এক্সচেঞ্জ স্টোর’ চালু রয়েছে। সেখানে সংগৃহীত প্লাস্টিকের একটি অংশ ব্যবহার করে এই ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়।