ছাইদুর রহমান নাঈম, কটিয়াদী ( কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:
আড়িয়াল খাঁ প্রবহমান নদের প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অন্তত ২০টির মতো খরা, ড্রিম ও কারেন্ট জালের বাঁধ রয়েছে। নদের এপার থেকে ওপার পর্যন্ত আড়াআড়িভাবে এই জালের দেয়াল তৈরি করা হয়েছে। এতে মাছের স্বাভাবিক বিচরণ হুমকির মুখে পড়েছে। পাশাপাশি এসব সর্বনাশা জালে ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য ও জলজ প্রাণী । কোনো প্রকার আইনের তোয়াক্কা না করে রীতিমতো মহানন্দে ধ্বংস করা হচ্ছে মৎস্যসম্পদ। মাছের পাশাপাশি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে মালবাহী নৌযান চলাচল।
এই পরিস্থিতি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী ও পার্শ্ববর্তী নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার সীমানাঘেঁষে বয়ে চলা প্রবহমান আড়িয়াল খাঁ নদের।
নির্বিচারে ও বাধাহীনভাবে মৎস্যসম্পদ এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের লীলাখেলা চলছে এসব স্থানে। এতে শিকারিরা লাভবান হলেও মাছের স্বাভাবিক বিচরণ যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি মাছের বংশবৃদ্ধিও ব্যাহত হচ্ছে। অবৈধভাবে মাছ নিধনের কারণে দেশি প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। এখন আর দেশি প্রজাতির মাছ বাজারে তেমন চোখে পড়ে না।
সরকার যেখানে মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধির জন্য নানা পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের যথাযথ তদারকির অভাবে সেই উদ্যোগের সুফল ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম বলে আশঙ্কা সচেতন মহলের।
নদের পাড়ের দুই এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের একটি শাখা নদ আড়িয়াল খাঁ। কয়েক বছর আগে সরকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে নদটি খননের উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময়ে নদে পানিপ্রবাহ কিছুটা বৃদ্ধি পায়। কাপাসিয়ার টোক থেকে পাকুন্দিয়া, কটিয়াদী, মনোহরদী ও বেলাবো হয়ে নদটি সরাসরি মেঘনায় মিলিত হয়েছে। বর্তমানে নদে সারা বছরই কমবেশি পানিপ্রবাহ থাকে।
কয়েক মাস আগে থেকে কটিয়াদী উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ চরপুক্ষিয়া অংশ থেকে শুরু হয়ে উত্তর চরপুক্ষিয়া, চকবাজার, পাইকান সেতুসংলগ্ন এলাকা, লোহাজুরী ইউনিয়নের পূর্বচর পাড়াতলা ও ইউনিয়নের শেষাংশসহ পোড়াদিয়া সেতু পর্যন্ত এসব জালের বিস্তার বেড়েছে। একই পরিস্থিতি নদের ওপারে পার্শ্ববর্তী মনোহরদী উপজেলার চরগোহালবাড়িয়া, পাইকান, বড়চাপা অংশেও।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নদের এপার থেকে ওপার পর্যন্ত আড়াআড়িভাবে বাঁশ, কাঠ, বাঁশের ভানা ও জাল দিয়ে উঁচু করে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। শুধু জাল ফেলার অংশটুকুর মুখ খোলা রাখা হয়েছে। একমাত্র গতিপথ হওয়ায় জালে নিশ্চিতভাবে মাছ ধরা পড়ে। এর মধ্যে পোনামাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী আটকে যাচ্ছে। কোথাও আবার এপার থেকে ওপার পর্যন্ত কারেন্ট জাল টানানো হয়েছে। দূর থেকে বোঝার উপায় না থাকলেও কাছে গিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট দেখা গেছে।
জালের কারণে প্লাস্টিকের পাইপবোঝাই একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকাকে আটকে থাকতে দেখা গেছে। এতে নৌকার মাঝিদের ভোগান্তি বেড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জালালপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ চরপুক্ষিয়া ফকিরবাড়ি ঘাটসংলগ্ন নদে একই এলাকার মানিক, কামাল, শামীম ও নজরুল গংদের তিনটি জাল রয়েছে। এর পেছনে অর্থায়ন করছেন আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। কয়েক কিলোমিটার সামনে উত্তর চরপুক্ষিয়া চকবাজারসংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় হাসেন, মুরশিদ, আসাদ, শওকত আলীসহ বেশ কয়েকজন রয়েছেন। সেখানে চারটি জাল দেখা গেছে।
পার্শ্ববর্তী মনোহরদীর চরগোহালবাড়িয়া গ্রামের খিতিশসহ কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে কারেন্ট জাল ব্যবহার করছেন। পাইকান সেতুসংলগ্ন নদে তিনটি বড় জাল রয়েছে। সেখানে নেতৃত্বে রয়েছেন পাইকান এলাকার রফিজ উদ্দিন, হাসু, আলামিন, সোহেল, নুর ইসলাম, জালাল উদ্দীন, সোহেলসহ আরও কয়েকজন। কয়েকজন পেশায় জেলে হলেও বেশির ভাগই মৌসুমি মৎস্যশিকারি। এ ছাড়া জামালপুর গ্রাম থেকে বিন্নাবাইদ ও পোড়াদিয়া পর্যন্ত আরও ১০ থেকে ১৫টি জাল রয়েছে।
নাম-পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক জালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, তাঁরা মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এসব জাল দিয়ে মাছ শিকার করা ঠিক কি না, তা তাঁদের জানা নেই।
কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুরী ইউনিয়নের পূর্বচর পাড়াতলা এলাকার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য সজল বলেন, ‘নদের পাড়ে আমার বাড়ি। চোখের সামনেই দেখি, লম্বা জাল দিয়ে এপার থেকে ওপার পর্যন্ত বাঁধ দিয়ে মাছ শিকার করা হচ্ছে। পোনামাছসহ সব ধরনের জলজ প্রাণী উঠে আসে। কয়েকজন লাভবান হলেও মাছ তো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এসব দেখার কেউ নেই।’
জালালপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ চরপুক্ষিয়া এলাকার বাসিন্দা কৃষক আফাজ উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, ‘সবকিছুই তো শেষ হইয়া গেছেগা। এসব গজব জালের কারণে নদে মাছ নাই আর। সব ছাইক্কা লইয়া যায়গা। আমরা ঠেলা জাল লইয়া গেলে মাছ পাই না অহন।’
পার্শ্ববর্তী মনোহরদীর বড়চাপা ইউনিয়নের বাসিন্দা মোখলেস উদ্দিন বলেন, ‘নদের এপার-ওপারের কিছু অসাধু লোকজন মিলে এসব অবৈধ খরা ও কারেন্ট জালের বাঁধ দিয়ে মাছের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত করছে। নৌকা অনেকক্ষণ আটকে থাকে। প্রশাসনের কোনো নজর নেই। সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ জরুরি। এমন চলতে থাকলে মাছ আর থাকবে না।’
এ বিষয়ে কটিয়াদী উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. কাউছার মিয়া বলেন, ‘কোনো অবস্থাতেই প্রবহমান নদে এভাবে এপার থেকে ওপার পর্যন্ত জালের বাঁধ দিয়ে মাছ শিকার করতে পারবেন না কেউ। তা ছাড়া কারেন্ট জাল ব্যবহার নিষিদ্ধ। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেব।’
মনোহরদী উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. রাফি আফরোজ সনি বলেন, ‘আমাদের অংশে কিছুদিন আগে অভিযান পরিচালনা করেছিলাম। এখন পুনরায় একাধিক জায়গায় জালের বাঁধ দেওয়া হয়েছে, তা আপনার কাছ থেকে জানলাম। শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, ‘প্রবহমান নদে কেউ জালের বাঁধ দিতে পারবেন না। মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার বদ্ধপরিকর। অবৈধ জাল থাকলে অভিযান চলবে। এ বিষয়ে শিগগিরই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
মনোহরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘আপনার কাছ থেকে বিষয়টি অবগত হলাম। নদের মধ্যে জালের বাঁধ থাকলে মাছের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খোঁজ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’




















