কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার জারইতলা ইউনিয়নের সাজনপুর গ্রামের আঠারোবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে দীর্ঘদিন ধরে বসছে গরু-ছাগলের হাট। প্রতি বুধবার বিদ্যালয় চলাকালেই মাঠ ও আশপাশের সড়ক দখল করে হাট বসায় ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে শিক্ষার্থীরা এবং মাঠে খেলাধুলার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে তারা।
বুধবার (২৬ আগস্ট) দুপুরে সরেজমিনে বিদ্যালয় মাঠে গিয়ে হাট বসার এমন চিত্র দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, ২০০৯ সাল থেকে বিদ্যালয়ের মাঠে নিয়মিত পশুর হাট বসছে। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে হাট বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়নি।
স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিনে জানা যায়, জারইতলা ইউনিয়নের গোপীরায়ের হাটটি জেলার বড় গরু-ছাগলের হাটগুলোর একটি। প্রতি বুধবার বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশের জেলা থেকে ট্রাক, পিকআপ ও অন্যান্য যানবাহনে গরু-ছাগল নিয়ে আসেন বিক্রেতারা। এসব যানবাহন সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকায় নিকলী থেকে বাজিতপুর, ভৈরব ও কটিয়াদীসহ বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। এতে সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি রোগীবাহী যানবাহনও সমস্যায় পড়ে বলে স্থানীয়রা জানান।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, গোপীরায়ের বাজারের নামে হাটটি ইজারা দেওয়া হলেও বাজার এলাকায় পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় প্রতি বুধবার বিদ্যালয়ের মাঠ ব্যবহার করা হয়। হাটে স্থানীয় কৃষকদের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরাও গরু নিয়ে আসেন।
বিদ্যালয়ের মাঠে পশুর হাট বসার কারণে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। হাটের দিনে গরু ও অন্যান্য পশু আনা-নেওয়ার গাড়ি চলাচল, ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড় এবং পশুর বর্জ্যের কারণে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতেও সমস্যা হয়। হাট শেষে মাঠে গোবর ও অন্যান্য বর্জ্য পড়ে থাকায় খেলাধুলার পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের সাবেক কয়েকজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২০০৯ সাল থেকে মাঠে পশুর হাট বসছে। তাঁদের দাবি, এর পর থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কমার সঙ্গে হাট বসার সরাসরি সম্পর্কের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল রহিম বলেন, বিদ্যালয়ের পাশেই জারইতলা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) কমপ্লেক্স রয়েছে। সেখানে পশু চিকিৎসাকেন্দ্রসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা দেওয়া হয়। কিন্তু হাটের দিন মাঠ ও সড়কে মানুষের ভিড় এবং পশু চলাচলের কারণে স্থানীয়দের ইউনিয়ন পরিষদের সেবা নিতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
বিদ্যালয় মাঠে হাট বসানো নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আপত্তি রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে হাট বন্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে এবং বিদ্যালয়ের মাঠে পশুর হাট না বসানোর নির্দেশনা দিয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু সিদ্দিক বলেন, বিদ্যালয় মাঠে গরুর হাট বসানো নিয়ে বাজার কমিটিকে একাধিকবার বলা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন তাদের দুইবার জরিমানাও করেছে। বিষয়টি জানিয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছেন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) জেসমিন আক্তার বলেন, স্কুল মাঠে গরুর হাট বসানোর কোনো নির্দেশনা নেই। প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ দখল করে হাট বসানো হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, বিদ্যালয়ের মাঠ দখল করে পশুর হাট বসানোর কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে নিকলী উপজেলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে। বিদ্যালয়ের মাঠে পশুর হাট বসিয়ে যাতে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে হাটটির ইজারামূল্য নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ১৪৩২ বঙ্গাব্দে হাটটির ইজারামূল্য ছিল ৩ কোটি ৭৫ লাখ ৫০ হাজার ৮০০ টাকা। চলতি ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে তা কমে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকায় ইজারা হয়েছে বলে তারা জানান। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ইজারামূল্য কমার কারণ ও দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও আঠারোবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে গরুর হাট সরাতে অভিযান চালানোর খবর প্রকাশিত হয়েছিল। সে সময় অভিযানে হাট বসানোর অভিযোগে একজনকে জরিমানা করা হয় বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়।




















